রিয়েল এস্টেট ব্যবসা এবং কিছু পরামর্শ
দৈনিক সংগ্রাম
শুক্রবার ১০ জুলাই ২০২০
দিদারুল আলম মজুমদার : সুর সম্রাট ওস্তাদ ফুলঝুরি খানের পূর্ব রামপুরাস্থ প্লটটির যৌথ উন্নয়নকল্পে আমরা ডেভেলপার হিসেবে শতকরা ৬০ ভাগ ও ভূমিদাতা হিসেবে ফুলঝুরি খানের ওয়ারিশগণ ৪০ ভাগ পাবেন হিসেবে প্রথম চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিলো ২০০৮ সালের শুরুর দিকে। এই কাজের মাধ্যমেই রিয়েল এস্টেট জগতে পদার্পণ। ওয়ারিশি সমস্যার ফলে প্রথমবারের চুক্তি বাতিল করে আবার চুক্তি করা লেগেছে বিধায় প্রকল্পটিতে কাজ শুরু করতে ও শেষ করতে অনেক সময় লেগে যায়। ইতোমধ্যে আমাদের সাইনবোর্ডের সমালোচনা শুরু হলো যে, কোম্পানী কাজ ধরছে না বলে। পরে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি সমাধান হলেও ঐ এলাকার জনগণকে ক্লিয়ার করার কোন পদ্ধতি ছিলো না বলে ডেভেলপার এর সুনাম কিছুটা বিনষ্টই থেকে যায়।
ইতোমধ্যে আরো প্রজেক্ট গ্রহণ এর পাশাপাশি ক্লাইন্ট ও পরিচিত জনদের লেনদেন শুরু হয়। সবাই রিয়েল এস্টেট এর ব্যবসায় অনেক ভালো হচ্ছে বলে জড়িয়ে পডে। এই ব্যাপক সাড়া সৃষ্টির দরুন ঢাকা শহরের জমির মালিকগণের মাঝেও চাহিদার পরিবর্তন হতে থাকে। রেশিও দাবি করে থাকেন শতকরা ৫০ ভাগ এবং সাথে কিছু সাইনিং মানি। এই চাহিদা বৃদ্ধি পেয়ে কোন কোন এলাকায় শতকরা ৬০ ভাগ ও কাঠা প্রতি একটি ভালো অংকের সাইনিং মানি ছাড়া চুক্তি হবেনা বলেও কথা আসে।
তারপরো নতুন নতুন কোম্পানী বৃদ্ধি এবং তাদের কাজ চাই শর্তে এই চাহিদার সৃষ্টি করে ব্যবসাটা হয়ে গেলো তুলনামূলক বেঁচে থাকার মত। এদিকে সরকার তার রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য রেজিস্ট্রেশন, ইউটিলিজ, রাজউক খরচসহ যাবতীয় খরচ ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করে। এক পর্যায়ে গ্যাসের কানেকশন বন্ধ করে দিলে দেখা যায় একটি বাড়িতে ২০ টি ফ্ল্যাট তৈরি হলেও ৬ টি ফ্লাটে গ্যাসের কানেকশন আছে, আর বাকি ১৪ টিতে কানেকশন দেয়া যাচ্ছে না। কেমন যেন এক দেশে দুই নীতি। আবার ব্যাংকগুলো হাউজিং সেক্টরে গ্যাস নেই বলে বিনিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে।
এদিকে আমাদের সকলের কাছে পরিষ্কার যে ৫ টি মৌলিক অধিকার এর মাঝে মাথা গুজানোর জন্য একটি ঠিকানা থাকলে বাকীটার জন্য প্রয়োজন অনেকটা অলস টাকার। আর প্রয়োজন হয় ব্যবসায়িক চিন্তার। কালের পরিক্রমায় বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, ভূমির মালিকদের চাহিদা বৃদ্ধি, সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টগুলোর খরচ বৃদ্ধি ও ক্লাইন্টদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার দরুন এই সেক্টরে মন্দাভাব চলছে গত অর্ধযুগ থেকেই।
এর সাথে যুক্ত হলো করোনা ভাইরাস এর মত মহামারি। ঢাকা শহরে বাসা ভাড়া যারা থাকতেন তাদের রুজির সিংহ ভাগ চলে যেতো বাসা ভাড়ায়। তাই এখন অনেকেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যে, যেহেতু বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ, সেহেতু যার যার বাড়িতে থাকলে কেমন হয়। এই চিন্তার শুরুতেই বাড়িগুলোর সম্মুখে টু-লেট ঝুলছে অনেক। মহামারি দীর্ঘ হলে কি হবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামততো সবার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ভালো কোন খবর কেউ দিতে পারছেন না। তবে রিযিকের মালিক আল্লাহ, যদি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখেন, তাহলে থাকা খাওয়াসহ আনুষঙ্গিক বিষয়াদির ব্যবস্থাও তিনিই করবেন বলে এই বিশ্বাসটি আমাদের সাহস যুগাচ্ছে।
ইতোমধ্যে এই সেক্টরে দেশী-বিদেশী ক্লাইন্ট ও বিনিয়োগকারীগণ কোন রকম খেয়ে-পরে জীবনযাপনের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরী বলে ফ্ল্যাট প্লট ছেড়ে দেয়ার যে চিন্তা শুরু করেছেন, তাতেও উদ্যোক্তাগণের উপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই মুহূর্তে আরো অপেক্ষা ছাড়া কোনভাবেই বিক্রি করে ক্যাশ করা সম্ভবপর নয়। মহামারি শেষ হওয়ার পরও পারস্পরিক সহযোগিতা সহমর্মিতা ছাড়া এই ধকল থেকে উঠে আসতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে বলে মনে করি।
তবে আশার বাণী হচ্ছে, সরকার ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে রেজিষ্ট্রেশন খরচ কমিয়েছে। ব্যাংকগুলো বিনিয়োগে তাদের মার্জিন এক সংখ্যায় নিয়ে এসেছে। ভূমিদাতা ও ক্লাইন্টগণ প্রকল্প হস্তান্তরে সময় বৃদ্ধি ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই বলে তা বুঝতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া বিনিয়োগকারীগণও আরো বিনিয়োগের ব্যবস্থা করে প্রজেক্ট উঠিয়ে টাকা বের করে আনতে হবে বলে চিন্তা করছেন।
তবে এই জগতের ব্যবসায় কৌশলী হলে খরচ কমিয়ে একটু দেরীতে হলেও পুঁজিসহ ভালো ব্যবসা বের করে আনা সম্ভব হয়। শর্ত হলো কোনভাবেই খরচ শুরু হওয়া প্রকল্প ঠেকিয়ে না রেখে দ্রুত শেষ করা এবং যেটা শুরু হয়নি সেটার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা।
আপাতত অফিস ছেড়ে দিয়ে প্রজেক্টে অফিসের কাজ চালিয়ে ব্যয় সংকোচনের পদক্ষেপ নিয়ে স্টাফ ছাঁটাইয়ের পথে না গিয়ে প্রয়োজনে আংশিক বেতন দিয়ে রাখা যায়। কারণ সবাই যার যার রিযিক নিয়েই জন্ম নিয়েছে বলে আমরা জানি। তবে আফসোসের বিষয় হলো নিজের অফিস আদালত বাড়ি গাড়ী সব ঠিক রাখার জন্য অনেকেই এই করোনাকালীন সময়ে জনবল ছাঁটাইতে গিয়েছেন। যা কোনভাবেই ঠিক হয়নি। আবার স্টাফদেরও বুঝতে হবে যে এখন সমস্যার দরুন যা পাই বা না পাই লেগে থাকি। আল্লাহ বাঁচিয়ে তুললে সবই হবে।
আরেকটি বিষয় সংশ্লিষ্টগণ বিবেচনা করতে পারেন। এখন বহুতল ভবনের বেইজ উঠাতে গিয়ে কোটি টাকা খরচ করে প্রণোদনাতে না যাওয়া। যথাসম্ভব টিনসেড দিয়ে এসমস্ত জায়গায় গোডাউন দোকান বা থাকার রুম করে ভাড়া দিয়ে কিছু উপার্জন সাপেক্ষে সবাইকে নিয়ে চলা যায় কি না দেখা যেতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো যেসব কোম্পানীতে একের অধিক পার্টনার বা শেয়ার হোল্ডার রয়েছে, সেসব কোম্পানীর প্রজেক্ট সমূহ পার্টনারদের যাদের সলভেন্সী ভালো আছে তাদের মধ্যে ভাগ করে দিতে পারলে প্রজেক্টও সাকসেস হলো এবং ভাগে ঐ সংশ্লিষ্ট পার্টনারও সম্পদের মালিক হলো। এই সিস্টেমে অনেকেই ভালো সাকসেস হতে পারবে বলে মনে করি।
রেজিস্ট্রেশন খরচ কমানোর জন্য জমির শেয়ার ক্রয় করে অনেকে বিল্ডিং তৈরি করছেন। এতে বাটোয়ারা দলিল তৈরি করা লাগে সবার উপস্থিতিতে। ব্যাংক বিনিয়োগ লাগলেও এতে সমস্যা হয়। তারপরো থাকার জন্য চিন্তা যারা করেন তাদের জন্য এটি অনেক সাশ্রয়ী চিন্তা। হাউজিং সেক্টরটি এত ধীরগতির সেক্টর যে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্য সেক্টরে যাওয়াও মুশকিল। আবার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা যে সেক্টরে অর্জিত হয়েছে সে সেক্টর ছেড়ে অন্য সেক্টরে গিয়ে ভালো করাও দায়। তবে সমন্বিতভাবে অথবা ব্যক্তিগতভাবে ছোট পরিসরে কিছু নগদ আইটেম শুরু করতে পারেন। তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে খুবই সুচিন্তিতভাবে।
এই সেক্টরের এক ব্যবসায়ী বললো, যে আমার কাছে টাকা পায়, সে হায়াত মউত এর কথা বলে। আর আমি যার কাছে পাই সে বলে যে, আপনাদের কোন দয়ামায়া বা বিবেক নাই নাকি। তাই এক্ষেত্রে ক্লাইন্ট ও বিনিয়োগকারীদের ডিড ডকুমেন্টস ঠিক রাখার পাশাপাশি অস্থিরতা ও পরস্পর ভুল বুঝাবুঝি নিরসনে সংলাপের কোন বিকল্প নেই।
Comments
Post a Comment